যখন যৌথ পরিবার হতো তখন বাড়িতে একাধিক ঠাকুর, চাকর, কাজের লোক থাকতো। আমি যখন ছোট তখনকার অনেক ঘটনা মনে আছে। তখন ঠাকুর, চাকরের রিতিমত ইন্টারভিউ হতো, আর আমার ঠাকুমা ইন্টারভিউ নিতেন। আমরা ছোটরা আমাদের ঠাকুমাকে মামুনি বলে ডাকতাম।
একবার এক বামুন ঠাকুরের ইন্টারভিউ হচ্ছে। মামুনি প্রশ্ন করছেন যে বেদ কয় প্রকার? বা গায়ত্রী মন্ত্র পাঠ করে শোনাও। মানে পৈত্যা থাকলেই যে ব্রাহ্মণ বা বামুন হবে এটা আমাদের মামুনি মানতেন না। বামুন ঠাকুর ঠিক ঠাক উত্তর দিয়ে তো কাজ পেয়ে গেল।
কিন্তু সে যে রান্নার লোক নয় তা জানা গেল রান্না করার সময়। মামুনি আগের দিনের মানুষ, বামুন ঠাকুর ছাড়া বাড়িতে রান্না, এ কথা তিনি ভাবতেই পারতেন না। আর এখন মেথরও বাড়িতে রান্না করে। মামুনি এখন বেঁচে থাকলে হয়তো উপোস করে কাটাতে হতো।
মুসুর ডাল রান্না করছিল বামুন ঠাকুর, কালো জিরা ফোড়ন দেয়ার কথা। মামুনি তদারকি করতে ঠাকুর ঘরে গিয়ে রেগে কাই। ঠাকুর রান্না ঘরে যতো কালোজিরা ছিল সব মুসুর ডালে ঢেলে দিয়েছে। মামুনি তার ঘাড় ধরে রান্না ঘর থেকে বের করে দিলেন। মিথ্যা কথা বলে কাজে যোগ দেয়ার জন্য তাকে কষে এক চপেটাঘাত করলেন। এখনকার দিনে হলে মামুনিকে কাজের লোককে নিগৃহীত করার অপরাধে কোর্টের চক্কর কাটতে হতো।
যাইহোক বামুন ঠাকুরের আমাদের বাড়িতে রান্না করা আর হয়নি। কিন্তু আমার ঠাকুমা খুব দয়ালু মানুষ ছিলেন। ফলে বামুন ঠাকুরের পদস্খলন হলো। সে ঠাকুর থেকে অবনতি হয়ে চাকর হয়ে গেল। তার নাম ছিল নন্দ, মামুনি তাকে ডাকতেন নন্দা বলে।
এই নন্দা মামুনির খুব বিশ্বস্ত লোক ছিল, তাকে ছাড়া মামুনির একবেলাও চলত না। নন্দা খুব পরিশ্রমী মানুষ ছিল, সেই কাকভোরে স্নান টান সেরে বাজারে গিয়ে আমার কাকার জন্য একটুকরো পোনা মাছ কিনে আনত। কাকা সকাল সকাল মাছ ভাত খেয়ে অফিসে যেতো। তারপর আবার ঘন্টা দুই পরে বাজারে গিয়ে আমার বাবার জন্য কলা কিনে আনত। কারণ বাবা দুধ কলা দিয়ে ভাত খেয়ে অফিসে যেতো।
সবাই অফিসে চলে যাওয়ার পর নন্দা আবার বাজারে যেতো মামুনির বাজার করতে। ঠাকুমা বিধবা ছিলেন তার রান্নার জিনিসে মাছের ছোঁয়া লাগানো যেতো না, তাই আলাদা বাজার হতো। বেলায় আবার নন্দা বাজারে যেতো বাড়ির বাদবাকি সদস্যদের ও ঠাকুর, চাকর, কাজের লোকের বাজার করতে।
সবার খাওয়া দাওয়া হয়ে গেলে ঠাকুর, নন্দা আর বাদবাকি কাজের লোকজনের খেতে খেতে চারটে বেজে যেতো। তারপর নন্দা পাড়া ঘুরতে বের হতো। আবার তাকে দেখা যেতো সন্ধ্যা বেলায় উনুনে আঁচ দেয়ার সময়। তখনকার কলকাতায় সন্ধ্যা বেলায় সমস্ত বাড়িতে উনুনের ধোঁয়ায় ভরে যেতো। আবার মামুনি সারা বাড়িতে ধূনো দিতেন। আমাদের ছোটদের সেই সময় বেশ চোখ জালা করতো। এখনকার দিনে এসব হলে বাড়িতে বিক্ষোভ হয়ে যাবে। আমাদের ছোট বেলাটা অন্যরকম ছিল, এখনকার ছোটদের সাথে কোন মিল নেই। আবার সন্ধ্যার পরে বাজারে যেতো মাছ, তরিতরকারি কিনতে। রাতে বাড়িতে সবাই একসাথে খাওয়াদাওয়া করতো। তখনকার সময় খুব অল্প কিছু বাড়িতে রেফ্রিজারেটর ছিল। ফলে বারবার বাজারে যাওয়ার চল ছিল।
সত্তরের দশকে নকশাল আন্দোলনে উত্তাল কলকাতা। আমার ছোট মামা একজন বিখ্যাত নকশাল নেতা ছিলেন। ফলে বাড়িতে সময় অসময় লাল বাজার থেকে বাঘা বাঘা পুলিশ অফিসার সাথে বিশাল পুলিশ বাহিনী সার্চ করতে এসে হাজির হতো। একবার আমার খুড়তুতো দাদার জন্মদিন ছিল এবং যথারীতি এক বিখ্যাত বা কুখ্যাত পুলিশ অফিসার বিশাল বাহিনী নিয়ে হাজির। কিন্তু আমাদের (আমি আর আমার জমজ ভাই) জন্মদিন ছিল না। কিন্তু পুলিশের কাছে খবর ছিল যে জন্মদিনে মামাবাবু আসবেন। অফিসার এসে বিষয়টি বুঝতে পারলেন এবং খবর প্রদানকারী বা খোচড় কে এক হাত নিলেন।
তখনকার দিনে পুলিশ বাড়ির কাজের লোকজনকে মাসিক অর্থের বিনিময়ে ইনফরমারের কাজে নিয়োজিত করতো, এদেরকেই খোচড় বলা হতো। সবাই কে অবাক করে দিয়ে জানা গেল যে বাড়ির বামুন চাকর নন্দা পুলিশের ইনফরমার। আগেকার দিনের মানুষ বাইরের রাজনিতী টিতি তেমন বুঝতেন না, তবে সংসারের রাজনীতিতে অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন। বাড়ির খবর বাইরে চলে যাচ্ছে এটা জেনে মামুনি খুব রেগে গেলেন এবং সেই রাত্রেই নন্দাকে পত্রপাঠ বিদায় করে দেয়া হলো। এরপর আর বাড়িতে সর্বক্ষণের চাকর রাখা হয়নি।
Discover more from Tuki O Taki
Subscribe to get the latest posts sent to your email.