আমাদের ঠাকুমার একজন বাসন মাজার লোকের দরকার পড়েছিল। পাড়ার এক ভদ্রলোক তাদের বাড়ির অনেক দিনের এক বিশ্বস্ত মহিলাকে পাঠালেন। আমি আর আমার ভাই দুজনে জমজ, ফলে মা দুই জনকে নিয়ে একেবারে হিমশিম অবস্থা। তখন মামুনি মানে আমাদের ঠাকুমাকে আমরা মামুনি বলে ডাকতাম, সেই মহিলাকে আমাদের দেখাশোনার জন্য বহাল করলেন।
সেই থেকে খোম্মা আমাদের জীবনের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে গেল। ঐ মহিলার নাম ছিল বিনাপানি সরকার, তবে সবাই তাকে খোকার মা বলে ডাকত। কিন্তু কেন যে খোকার মা বলত সেটা এক রহস্য ছিল যার সমাধান কখনো করা যায়নি। কারণ তার কস্মিনকালেও কোনো খোকা ছিল না। তার ছিল একটি মেয়ে।
খোম্মা ছিল পূর্ব বঙ্গীয়, ওনার বাবার পানের বরজ ছিল। দেশ ভাগের পর খোম্মা কলকাতায় চলে আসে। বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের সময় ওপার বাংলা থেকে বহু মানুষ পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় নিতে এসেছিল। এরা সবাই সরকারের তৈরি বিভিন্ন ক্যাম্পে থাকতো। খোম্মার কাছে শোনা, যে মেয়ের ছোটবেলায় ভারতে চলে এসেছেন। মেয়ে বড় হয়েছে বিয়ে করেছে, সন্তানাদি হয়েছে কিন্তু ওনার সঙ্গে কোনরকম যোগাযোগ ছিল না। উনি সেই না চেনা মেয়ের খোঁজে ক্যাম্প থেকে ক্যাম্পে ঘুরে বেড়িয়েছেন। সেই সময় এই রকম ঘটনা হামেশাই ঘটতো।
শেষে উনি সত্যি মিথ্যে জানি না ওনার মেয়েকে খুঁজে পেয়েছিলেন বা পাননি। কিন্তু এক মহিলা ওনার মেয়ে হয়ে গেল। উনি সেই মেয়েকে ওনার সর্বস্ব দিয়ে দিলেন। খোম্মা আমাদের ছোট থেকে দেখাশোনা করার কারণে নয়, এক অদ্ভুত সম্পর্কে জড়িয়ে গেল। আমার ভাই ছোটবেলায় সবার কাছে যেত না। ওর মা, দাদু, আমাদের মেজ কাকি আর খোম্মা ছিল পছন্দের মানুষ। খোম্মা ভাইকে ভীষণ রকমের ভালো বাসত। সব সময় ভাইকে কোলে নিয়ে ঘুরতো, আর ভাই ছোটবেলায় সেভাবে খাওয়া দাওয়া করত না। তার থেকে খোম্মা বলত, ভাই দুর্বল তাই ভাইকে কোলে নিয়ে ঘোরে।
একবার কালী পূজোর সময় আমাদের বাড়ির ছাদে বাজি পোড়ানো হচ্ছে। তখন ভাই ছাদে পড়ে থাকা পোড়া তারাবাতি খালি পায়ে মাড়িয়ে দিয়েছিল। তার ফলে পায়ের তলা পুড়ে গিয়ে পেকে যায়। এজন্য অনেক দিন ভাইকে কোলে চেপে ঘুরতে হয়েছে। সেই ঘা কমে যাওয়ার পরেও ভাই খোম্মার কোল থেকে নাবতে চাইতো না। তখন ভাইয়ের বেশ মজা সবসময় কোলে চড়ে ঘুরতো।
দূর্গা পূজার সময় আমরা খোম্মার সাথে রাস্তায় করে বসে মানুষ এর চলাচল দেখতাম। পার্কে যেতাম, খোম্মা ভাইয়ের হাত কখনো ছাড়তো না। একবার খোম্মা যথারীতি ভাইকে নিয়ে ব্যস্ত আর আমি পুকুরে সাঁতার কাটা দেখতে দেখতে হারিয়ে গিয়েছিলাম। যদিও আমি এতে বিচলিত হইনি। এদিকে বাড়িতে হুলস্থুল, পার্কের পাশে মামার বাড়ি। মামা, মামি, দাদু, কাকীরা, মা, পাড়ার লোকজন সবাই খুঁজছে। শেষে ছোঠকাকী আমাকে খুঁজে পায়। সবাই খোম্মাকে খুব বকলো।
আমরা যতো বড় হতে লাগলাম খোম্মার আমাদের প্রতি স্নেহ ভালোবাসা বাড়তেই থাকল। ততোদিনে খোম্মার দৌলতে অনেক কিছুর স্বাদ পেয়েছি। খোম্মা বেশ বেলায় বাজার থেকে বিভিন্ন রকমের জিনিস নিয়ে আসত। তখন কাছিম বা কচ্ছপ খাওয়া সরকারি ভাবে বন্ধ হয়নি। খোম্মার দৌলতে কচ্ছপের মাংস, কচ্ছপের ডিম ভাজা, হাঁসের মাংস, বিভিন্ন রকমের না জানা ফলপাকুরের স্বাদ নেয়া হয়ে গেছে। খোম্মা তখন বছরে একবার দেশে যেত, আর ফেরার পর আমি আর ভাই অপেক্ষা করে থাকতাম খোম্মা কি আনছে আমাদের জন্য তা দেখার জন্য। কুলের গুঁড়ো, ঢ্যাপের খই আরো কতকি। এছাড়া বিভিন্ন রকমের আচার এসব তো ছিলই।
খোম্মার এক নাতনি ছিল, সে মাঝে মধ্যেই আমাদের বাড়িতে আসত। সে বলতো খোম্মা দেশে গেলে সবসময় আমার বাবুরা ছাড়া অন্য কোন কথাই বলতো না। খোম্মা আমাদের যৌথ পরিবারের সব ভাই বোনদের খুব কাছের মানুষ ছিল। খোম্মা খুব পান খেত, আমাদের পান খাওয়ার শুরু খোম্মার হাতে। একদিন আমাদের পিসতুতো দিদি আমাদের থেকে বছর দেড়েকের বড়ো, ও ছোটবেলায় খুব পাকা পাকা কথা বলত। একদিন ওকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, শেষে দেখা গেল ও ছাদে খোম্মার সমস্ত পান রোদে শুকাতে দিচ্ছে। আমাদের ভাইবোনদের কাছে খোম্মা ছিল খোম্মা, খম্মু প্রভৃতি।
খোম্মা দুক্তা খেত ফলে সব সময় জিব টকটকে লাল হয়ে থাকতো। এর জন্য মনে হয় জিবে ঝাল লাগতো না। একসাথে অনেক ঝাল ঝাল লঙ্কা খেয়ে নিতো। আমরা ভাই বোনেরা সবাই বসে বসে খোম্মার খাওয়া দেখতাম। আমরা যখন বড়ো হতে শুরু করেছি তখন খোম্মার শরীরের জোর কমে এসেছিল। মা বাবা খোম্মাকে কাজ করতে দিত না। একদিন ওনার মেয়ে এসে হাজির তার ধারণা হয়েছিল খোম্মার সম্পত্তি তে হয়তো আমরা ভাগ বসাবো। সে এসে তুমুল ঝগড়া শুরু করল, খোম্মা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে বসে ছিল। শেষে সে তার মাকে নিয়ে চলে গেল। যাওয়ার সময় খোম্মার সে কি কান্না। আমাদের চোখেও জল, পরে একবার তার নাতনি এসেছিল। মা বলেছিল খোম্মার সমস্ত খরচ এমনকি চিকিৎসার খরচ দেবে। চোখে ছানি হয়েছিল সেটাও ওনার মেয়ে কাটাতে দিল না। আমার বাবুরা বলে কেঁদে কেঁদে শেষে চোখে আর কিছু দেখতে পেত না।
এর বেশ কিছুদিন পর খোম্মার নাতনি এসে খবর দিল যে খোম্মা আর নেই। যখন খোম্মাকে তার মেয়ে নিয়ে গিয়েছিল তখন কতবার আমি আর ভাই ওরকম দেখতে বয়স্ক কাউকে পিছন থেকে দেখলে ছুটে গিয়েছি। এখনো মনে পড়ে খোম্মার কথা, বাইরের মানুষ যার সাথে রক্তের কোন সম্পর্ক নেই সেও ভালোবাসার বন্ধনে পরম আত্মীয় হয়ে যায়।
Discover more from Tuki O Taki
Subscribe to get the latest posts sent to your email.