সুন্দরবনের ভুতুড়ে নৌকা

5–8 minutes

অনেকেই ভুত আছে বলে বিশ্বাস করে না। ভুত কথাটার উৎপত্তি হলো ভূতকাল মানে অতীত। আসল বিষয়টি হলো সবাই ভুত দেখতে পায় না। ভুত আদতে আত্মা যাকে সাদা ভাষায় আমরা প্রাণ বলি। দেহ একটি জৈবিক যন্ত্র তাকে চালায় যে সে হলো প্রাণ বা আত্মা। একমাত্র যারা আধ্যাত্মিক তারাই আত্মায় বিশ্বাস করে এবং এদের মধ্যে কিছু মানুষ ভুতে বিশ্বাস করে।

ভুতের দর্শন যে পায় তাকে তন্ত্র শাস্ত্রের ভাষায় প্রেত সিদ্ধ বলে। এই সিদ্ধি একটি জটিল সাধনার দ্বারা উপলব্ধ হয়। এই প্রেত সিদ্ধরা খালি চোখে প্রেত দেখতে পায়, উপস্থিতি টের পায়, এমনকি প্রেতাত্মার সাথে কথা পর্যন্ত বলতে পারে। এদের সিদ্ধির শক্তিতে সর্বোচ্চ চারটি প্রেতকে এরা বশে রাখতে পারে।

সুন্দর বনে যতো না বাঘ আছে তার থেকে বেশি রয়েছে ভুত। কয়েক হাজার গুণ বেশি। কিরকম ভুত একটু ব্যাখ্যা করলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। এই বন জঙ্গল যুগ যুগ ধরে একরকম রয়েছে এর কোন রকম পরিবর্তন হয়নি বা হ‌ওয়ার সুযোগ নেই। ফলে ভুত প্রেত প্রতিস্থাপিত হতে পারছে না বা মুক্তি পাচ্ছে না।

সাধারণ ভাবে কারোর শ্রাদ্ধ চলাকালীন অবাঞ্ছিত ভুত প্রেতর মুক্তির মন্ত্র ও ক্রিয়া করার চল রয়েছে। কিন্তু সুন্দরবনের গভীর জঙ্গলে কেই বা আর শ্রাদ্ধ করবে? ফলে অপঘাতে যাদের মৃত্যু হয়েছে তাদের মুক্তির পথ এক প্রকার বন্ধ। তাই এই স্থান কে নরক বললে ভুল হবে না।

আগে সুন্দরবনে সুরম্য নগর সভ্যতা ছিল যা পর্তুগিজ এবং মগ জলদস্যুদের অত্যাচারে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। বলা যায় কারোর অভিশাপে এই ঘটনা ঘটে থাকবে। আমার এক পূর্ব পুরুষ একবার নৌকা পথে সুন্দরবন দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন তিনি শৌচ কার্য করতে জঙ্গলে যান। সেখানে তিনি দুই ঘড়া সোনার মোহর দেখেছিলেন। সুতরাং বলাই যায় যে সুন্দরবনে একসময় ধনী ব্যক্তিদের বসবাস ছিল।

সুন্দরবনে মানুষের গোঙ্গানির শব্দ বা কান্নার শব্দ পাওয়া টা খুব একটা অসাধারণ ব্যাপার নয়, অনেক মাঝি মাল্লা দের এই অভিজ্ঞতা রয়েছে। সাধারণ ভাবে বাঘ বা কুমীর আক্রমণ করলে মানুষ সঙ্গে সঙ্গে মরে যায় না। ভয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে, বাঘের সভাব অনেকটা বেড়ালের মতো। শিকার ধরে যে সবসময় সঙ্গে সঙ্গে খেতে শুরু করবে এটা নাও হতে পারে। অনেকক্ষন ফেলে রেখে দেয়, সাধারণ ভাবে বাঘেদের এলাকা ভাগ থাকে ফলে শিকার চুরি যাওয়ার ভয় থাকে না। এরকম অনেকবার হয়েছে যে বাঘ ধরে নিয়ে যাওয়ার পর জ্ঞান ফিরে নিরাপদ জায়গায় গিয়ে প্রাণ বাঁচিয়েছে।

অনেক কুমীর এক সাথে থাকলে শিকার ছিঁড়ে খায়। কিন্তু একাকী হলে অনেক সময় বাসায় টেনে নিয়ে গিয়ে ফেলে রাখে। এরকম অনেক সত্যিকারের গল্প রয়েছে যে শিকার অর্থাৎ যাকে কুমীর ধরেছিল সে জ্ঞান ফিরে পেয়ে কুমীরের বাসা থেকে পালিয়ে বেঁচেছে।

আগে সুন্দরবনে কিছু কিছু জায়গায় খুলে দে খুলে দে বলে একটি গোঙ্গানির শব্দ শোনা যেত। পর্তুগিজ জলদস্যুদের হাত থেকে বাঁচতে অনেকেই সোনাদানা, পরিবার নিয়ে চোরা কুঠুরিতে লুকিয়ে থাকতো। এবং বাইরে হয়তো কোন বিশ্বস্ত লোক বা চাকর লুকিয়ে থাকতো। জলদস্যুরা চলে গেলে সে আবার খুলে দেবে চোরা কুঠুরির দরজা। কিন্তু জলদস্যুরা শুধু মাত্র টাকা পয়সা বা সোনা দানা লুট করতে আসেনি। তারা মানুষ ধরে অপহরণ করতো এবং চড়া দামে ইউরোপের আর ওয়েস্ট ইন্ডিজের কৃতদাস বাজারে বিক্রি করে দিত। এভাবে কতো বাঙ্গালী ওয়েস্ট ইন্ডিজ এবং ইউরোপের মানুষের সাথে মিশে গিয়েছে।

ভুতের ভুত হ‌ওয়ার খোঁজ না জানলে ভুতের গল্প কাল্পনিক চরিত্র ছাড়া কিছুই নয়। আমি প্রফেশনাল তান্ত্রিক বা তন্ত্র সাধক ফলে আমার দেখা ভুত সবসময় সত্য, কোন গাঁজাখুরি গল্প নয়। আমি একলা থাকি এবং যে বাড়িতে থাকি সেখানে ভুত যাকে বলে কিলবিল করছে। বাড়িতে কাজের লোক ভয়ে কাজ করতে চায়না, এমনকি বেশি টাকার প্রলোভন দেখিয়েও কাজ হয়নি। তাদের অনেকেই ভুতের কথা বলেছে। আমাদের পাশের বাড়িটি তো বিক্রি হয়ে গেল ভুতের উপদ্রবে। আমাদের আর ঐ পাশের বাড়ির মধ্যে একটি পাঁচিল রয়েছে। যার একটি স্থান অদ্ভুত রকমের। ঐ জায়গায় কখনোই প্লাস্টার করলে থাকে না। রাতের মধ্যে সব প্লাস্টার মাটিতে পড়বেই পড়বে।

পাশের বাড়িটি যারা কিনেছেন তারা একবার উদ্যোগী হয়ে আমাদের দিকে প্লাস্টার করল তারপর যা হ‌ওয়ার তাই হলো সকাল বেলায় দেখা গেল কে যেন সমস্ত প্লাস্টার খুলে ফেলেছে। আমাদের বাড়িটি কে আমি পোর্টাল বা স্টারগেট বলি কারণ এর মধ্যে দিয়ে বিভিন্ন ডাইমেনশন এ যাওয়া যায়। আমার একটি বাচ্চা রিট্রিভার রয়েছে তাকে মাঝে মধ্যেই দেখি কি দেখে সে খুব ডাকাডাকি করছে। আমি জানি সে অশরিরি দেখছ কিন্তু ওতো আর জানে না। আমার ভাই এর একটি দেশীয় কুকুর আছে, মাঝে মধ্যেই ও আমাদের বাড়িতে ঘুরতে আসে। অনেক সময় আমরা লক্ষ করে দেখেছি যে ও ছাদের সিঁড়িতে উঠতে ভয় পায়।

আমি ভুতে ভয় পাইনা অনেক সময় রাতে আগে একা একা ছাদে বা পিছনের বাগানে ঘুরে বেড়াতাম। অনেক কিছু দেখেছি অনেক ভুতুড়ে অভিজ্ঞতা রয়েছে তা অন্য কোথাও বলা যাবে। আজকে আবার সুন্দরবনের ভুতের গল্পে ফিরে যাচ্ছি।

তা বাঘ যখন শিকার খেতে শুরু করে তখন আক্রান্ত ব্যক্তির তো মৃত্যু হয়না। ভয়ে এবং আঘাতের যন্ত্রনায় সাধারণত সে অজ্ঞান হয়ে পড়ে। কিন্তু বাঘ তো মাংস ছিঁড়ে হাড় ভেঙ্গে খায় তখন আক্রান্ত ব্যক্তির জ্ঞান ফিরে আসে। সে দেখে বাঘ তাকে চিবিয়ে চিবিয়ে খাচ্ছে। ভয়ে তার মুখ দিয়ে গোঙ্গানির শব্দ বের হয়। এরকম একটা ভয়াবহ মৃত্যু তে আক্রান্ত ব্যক্তির প্রেত হ‌ওয়া ছাড়া দ্বিতীয় কোন পথ নেই। ফলে প্রতিদিন ও সময়ে সে গোঙ্গীয়ে ওঠে এবং কাছের নদীপথ ধরে নৌকা নিয়ে যখন কেউ যায় তখন জঙ্গলের নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে খানখান করে দেয় সেই গোঙ্গানির শব্দ।

এছাড়া সুন্দর বনে তো মানে জঙ্গলের মধ্যে মানুষের বসবাস নেই তাই এটি একটি নির্জন স্থান বলে বিবেচিত হয়। এখানে বহু মানুষকে গুম খুন করা হয়েছে। এজন্য এখানে একটি নিয়ম প্রচলিত আছে সেটা হলো কাউকে বাঘে ধরেছে বললেই হবে না তার দেহাবশেষ উদ্ধার করে আনতে হবে নয়তো প্রশাসন বাঘের হাতে মৃত্যু হয়েছে বলে মেনে নেবে না।

অনেক বছর আগের কথা, তখন আমি একটি ট্রাভেল এজেন্সি চালাই। সুন্দরবনে ট্যুর অপারেটর এর সাথে ব্যবসা করি। সুন্দরবনে ট্যুর গ্ৰুপে হয় অর্থাৎ অনেক ট্যুরিস্ট নিয়ে একটি গ্ৰুপ তৈরি হয় কোন একটি নির্দিষ্ট দিনের জন্য। ট্রাভেল এজেন্টদের আগে থেকেই ট্যুরের সিট কিনে রাখতে হয়। আমাকে আমার এক ক্লায়েন্ট সুন্দরবন ট্যুরের কথা বলেছিল। আমি সেইমতো দুটি সিট বুক করে রেখেছিলাম। কিন্তু শেষ মুহূর্তে লোকটি ট্যুর টাকে বাতিল করে দিল। তখন আর উপায় নেই, অগত্যা আমাকে যেতে হলো।

অনেক কে রিকোয়েস্ট করলাম আমার সঙ্গে যাওয়ার জন্য। কিন্তু কাউকেই পাওয়া গেল না। জঙ্গলে পৌঁছে সারেঙ্গ কে বললাম যে ভিতরের ছোট নদী বা খাল ধরতে। বাঘ দেখা ভাগ্যের ব্যাপার কিন্তু জঙ্গল অনুভব করতে হলে বাইরের বড়ো নদী এড়িয়ে ছোট নদী ধরলে জঙ্গলের স্বাদটা ঠিকঠাক পাওয়া যায়। সারেঙ্গ রাজি হলো নিয়ে যেতে কিন্তু একটি শর্ত দিল আর সেটা হলো যে কোন ভাবেই বোটের ইঞ্জিন বন্ধ করা যাবে না এবং কোন অবস্থায় ঘাট ছাড়া বোট থামানো যাবে না।

বোটের ইঞ্জিন বন্ধের বিষয়টি সজনেখালি থেকে বলে দিয়েছিল কিন্তু বোট থামানো যাবে না এই বিষয়টি পরিষ্কার হয়নি। আসলে সারেঙ্গরা ভুক্তভোগী এ পথে হাজার বার গেছে অনেক কিছু দেখেছে অনেক কিছু জানে। ঐ পথে একটি অভিজ্ঞতার কথা আমি 20 বছর পরেও ভুলতে পারিনি।

গভীর জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে আমাদের বোট যাচ্ছিল আর আমরা মোট 7 জন বোটের ছাদে বসে অরন্য উপভোগ করছিলাম। আমার একটি খুব দূরপাল্লার আর্মি দূরবীন রয়েছে, যা দিয়ে আমি এদিক ওদিক দেখছিলাম।

হঠাৎ ডান দিকে চোখ পড়লো তখন প্রায় দুপুর বেলা। একটি নৌকা আমাদের বোটের দিকে বেশ জোড়ে আসছে, এমন ভাবে সেটি আসছে যেন মনে হচ্ছে আমাদের বোটের সাথে তার ধাক্কা লাগবে। আমি সারেঙ্গকে বললাম বোট থামানোর জন্য, কারণ নৌকার যাত্রীরা কোন সাহায্য চাইতে পারে। সারেঙ্গ বলল বোট থামানো যাবে না। আর আপনি ওদিকে দেখবেন না। আমি এবং অন্যান্যরা বোটের ছাদ থেকে ঝুকে দেখতে লাগলাম যে নৌকা টি আমাদের বোটের গায়ে ধাক্কা দিতে চলেছে। কিন্তু ধাক্কা দেওয়ার আগের মুহূর্তে আর কিছুই দেখতে পেলাম না। বোটটি যেন বাতাসে মিলিয়ে গেল।

এটা যে একটি ভৌতিক ঘটনা এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু দিনে দুপুরে সুন্দরবনে ভুত দেখবো ভাবিনি। পরে সারেঙ্গ বলেছিল একবার থামলে ভুত টেনে নিয়ে যেতো আমাদের বোটকে। এভাবে কতো বোট না জানার কারণে কালের গর্ভে চিরকালের জন্য হারিয়ে গেছে।


Discover more from Tuki O Taki

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Reply